BOESL-এর মাধ্যমে কোন কোন দেশে যাওয়া যায় ও আবেদন প্রক্রিয়া

উন্নত জীবনের সন্ধানে বিদেশে পাড়ি জমানো লাখো বাংলাদেশির স্বপ্ন। কিন্তু এই স্বপ্নকে পুঁজি করে গড়ে উঠেছে এক বিশাল দালাল চক্র। জমিজমা বিক্রি করে, চড়া সুদে ঋণ নিয়ে দালালের হাতে ১০-১৫ লাখ টাকা তুলে দিয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন অসংখ্য মানুষ। ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে বা ভুয়া ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে বিদেশের মাটিতে জেল খাটার খবর এখন প্রতিদিনের বাস্তবতা।

অথচ, এই প্রতারণার হাত থেকে বাঁচতে আপনার সামনেই রয়েছে সম্পূর্ণ নিরাপদ, বৈধ এবং রাষ্ট্রীয় একটি বিকল্প ব্যবস্থা। আপনি যদি জানতে চান বোয়েসেলের মাধ্যমে কোন কোন দেশে যাওয়া যায় ও আবেদন প্রক্রিয়া ঠিক কেমন, তবে আপনি সঠিক জায়গায় এসেছেন। সঠিক তথ্য না জানার কারণে যে সুযোগগুলো এতদিন আপনার হাতছাড়া হচ্ছিল, আজ তার প্রতিটি ধাপ আমরা ডিকোড করব। এখানে কোনো কাল্পনিক প্রতিশ্রুতি নেই, আছে শুধু সরকারি ডেটা, অফিসিয়াল খরচ এবং নিজেকে প্রতারণা থেকে বাঁচিয়ে স্বাবলম্বী করার নিখুঁত দিকনির্দেশনা।

বোয়েসেল (BOESL) কী এবং কেন এটি সবচেয়ে নিরাপদ?

বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল) হলো প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় জনশক্তি রপ্তানিকারক কোম্পানি। এর প্রধান কাজ হলো জি-টু-জি (G2G) চুক্তির মাধ্যমে নামমাত্র খরচে বা সম্পূর্ণ বিনা খরচে বাংলাদেশিদের বিদেশে নিরাপদ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা।

প্রাইভেট রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো সাধারণত ব্যবসার উদ্দেশ্যে কাজ করে, যেখানে লাভের অংকটাই মুখ্য। কিন্তু বোয়েসেল কোনো ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান নয়। এটি বাংলাদেশ সরকারের একটি প্রতিষ্ঠান, যা সরাসরি বিদেশি নিয়োগকর্তা বা বিদেশি সরকারের সাথে চুক্তি করে কর্মী পাঠায়।

বোয়েসেল কেন নিরাপদ, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো তাদের আর্থিক স্বচ্ছতা। বোয়েসেলের কোনো ‘সাব-এজেন্ট’ বা ‘শাখা অফিস’ নেই। তারা কোনো প্রার্থীর কাছ থেকে নগদ অর্থ বা ক্যাশ গ্রহণ করে না। ভিসার প্রসেসিং ফি বা সার্ভিস চার্জ হিসেবে যেটুকু টাকা দিতে হয়, তা সরাসরি সোনালী ব্যাংক বা নির্ধারিত রাষ্ট্রীয় ব্যাংকে পে-অর্ডারের মাধ্যমে জমা দিতে হয়। যদি কোনো কারণে আপনার ভিসা না হয়, তবে দালালদের মতো বোয়েসেল আপনার টাকা আটকে রাখবে না; নির্ধারিত নিয়মে সার্ভিস চার্জ ফেরত পাওয়া যায়। এটিই বোয়েসেলকে দেশের সবচেয়ে বিশ্বস্ত এবং নির্ভরযোগ্য মাইগ্রেশন প্ল্যাটফর্মে পরিণত করেছে।

সরকারিভাবে কোন কোন দেশে যাওয়া যায়?

বোয়েসেলের গন্তব্যের তালিকা প্রতি বছরই আপডেট হয়। যখন যে দেশের সরকারের সাথে বাংলাদেশের চুক্তি হয়, বোয়েসেল সেই দেশে কর্মী পাঠায়। বর্তমানে বোয়েসেলের মাধ্যমে মূলত তিনটি প্রধান অঞ্চলে কর্মী পাঠানো হচ্ছে।

এশিয়ার দেশসমূহ (দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, জর্ডান)

এশিয়ার উন্নত দেশগুলোতে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে বোয়েসেল ঈর্ষণীয় সাফল্য দেখিয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়া এবং জাপান বর্তমানে সবচেয়ে আকর্ষণীয় গন্তব্য। এই দেশগুলোতে যেতে হলে নির্দিষ্ট ভাষা (কোরিয়ান বা জাপানি) শেখা বাধ্যতামূলক। অন্যদিকে, জর্ডানের গার্মেন্টস সেক্টরে বোয়েসেল নিয়মিত নারী ও পুরুষ কর্মী পাঠাচ্ছে, যেখানে যাওয়ার খরচ প্রায় শূন্য।

বোয়েসেলের মাধ্যমে ইউরোপের কোন কোন দেশে যাওয়া যায়? (ক্রোয়েশিয়া, রোমানিয়া, ইতালি)

অনেকেরই মনে প্রশ্ন থাকে, বোয়েসেল সার্কুলার 2026 ইউরোপ এর আওতায় কোন দেশগুলোতে যাওয়া সম্ভব? বর্তমানে বোয়েসেলের মাধ্যমে পূর্ব ও মধ্য ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশে ব্যাপক জনশক্তি রপ্তানি হচ্ছে। এর মধ্যে রোমানিয়া, ক্রোয়েশিয়া, বুলগেরিয়া, সার্বিয়া এবং পোল্যান্ড অন্যতম। ইতালির সাথেও নতুন জি-টু-জি চুক্তির আওতায় সিজনাল ও নন-সিজনাল কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া চলমান।

ইউরোপের দেশগুলোতে মূলত কনস্ট্রাকশন ওয়ার্কার, ওয়েল্ডার, প্লাম্বার, ইলেকট্রিশিয়ান, শিপইয়ার্ড ওয়ার্কার এবং এগ্রিকালচার বা কৃষিকাজের জন্য লোক নেওয়া হয়। তবে মনে রাখবেন, ইউরোপের ভিসা প্রসেসিং প্রক্রিয়া মধ্যপ্রাচ্যের মতো দ্রুত হয় না। বিদেশি কোম্পানির ডিমান্ড লেটার আসা, ওয়ার্ক পারমিট ইস্যু হওয়া এবং অ্যাম্বাসি ফেস করা—সব মিলিয়ে ৬ থেকে ৮ মাস বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে। তবে একবার সফলভাবে যেতে পারলে ইউরোপের উন্নত জীবনযাত্রা এবং সেনজেনভুক্ত দেশে (Schengen Area) ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ তৈরি হয়।

মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য গন্তব্য

মধ্যপ্রাচ্যে বোয়েসেল সাধারণত সাধারণ বা আনস্কিলড লেবার পাঠায় না। কুয়েত, কাতার এবং ওমানে বোয়েসেলের মাধ্যমে মূলত প্রফেশনাল নার্স, এক্স-রে টেকনিশিয়ান, ডাক্তার, সিভিল ইঞ্জিনিয়ার এবং হেভি ভেহিকেল ড্রাইভার নিয়োগ দেওয়া হয়। এছাড়া সেশেলস এবং মালদ্বীপের মতো দ্বীপরাষ্ট্রগুলোতেও ট্যুরিজম ও হসপিটালিটি সেক্টরের জন্য কর্মী পাঠানো হয়ে থাকে।

একনজরে দেশ, কাজের ধরন ও খরচের তালিকা:

দেশের নাম কাজের ধরন বা সেক্টর আনুমানিক সরকারি খরচ (টাকা) প্রসেসিং সময়কাল
দক্ষিণ কোরিয়া ম্যানুফ্যাকচারিং, কৃষি, ফিশারি ১,০০,০০০ – ১,৪০,০০০ ৪ – ৮ মাস
জাপান (TITP/SSW) কেয়ারগিভার, কনস্ট্রাকশন, মেকানিক ১,০০,০০০ – ১,৫০,০০০ ৬ – ৯ মাস
ইউরোপ (রোমানিয়া/ক্রোয়েশিয়া) কনস্ট্রাকশন, শিপইয়ার্ড, হোটেল সার্ভিস ২,০০,০০০ – ২,৫০,০০০ ৬ – ১০ মাস
জর্ডান গার্মেন্টস (মেশিন অপারেটর) সম্পূর্ণ ফ্রি (মেডিকেল ফি বাদে) ২ – ৩ মাস
কুয়েত / কাতার মেডিকেল প্রফেশনাল, টেকনিশিয়ান ৫০,০০০ – ৮০,০০০ ৩ – ৫ মাস

(বি.দ্র: উপরোক্ত খরচগুলো আনুমানিক এবং সার্কুলার ও এয়ার টিকেটের দামের ওপর ভিত্তি করে পরিবর্তনশীল।)

দক্ষিণ কোরিয়া (EPS) এবং জর্ডানে নিয়োগ প্রক্রিয়া: ২০২৬ সালের আপডেট

সরকারিভাবে বিদেশ যাওয়ার উপায় হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়া এবং জর্ডান এই দুটি দেশের মডেল সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় এবং সফল। এই দুটি দেশে যাওয়ার পদ্ধতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।

বোয়েসেল সার্কুলার কোরিয়া ২০২৬ (যোগ্যতা ও লটারি প্রক্রিয়া)

দক্ষিণ কোরিয়ায় কর্মী পাঠানোর জন্য এমপ্লয়মেন্ট পারমিট সিস্টেম (EPS) ব্যবহার করা হয়। এটি একটি অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক কিন্তু শতভাগ স্বচ্ছ প্রক্রিয়া। এখানে দালালের কোনো সুযোগ নেই।

কোরিয়ায় যেতে হলে আপনাকে প্রথমেই কোরিয়ান ভাষার দক্ষতা পরীক্ষা ‘ইপিএস-টপিক’ (EPS-TOPIK) এ পাস করতে হবে। প্রতি বছর বোয়েসেল সার্কুলার কোরিয়া 2026 প্রকাশিত হলে আগ্রহীদের অনলাইনে প্রাথমিক নিবন্ধন করতে হয়। এরপর একটি স্বয়ংক্রিয় কম্পিউটারাইজড লটারির মাধ্যমে ভাষা পরীক্ষায় বসার সুযোগ দেওয়া হয়। লটারিতে নাম আসলে আপনাকে ভাষা পরীক্ষা এবং পরবর্তীতে স্কিল টেস্ট বা দক্ষতা পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে। সব ধাপে উত্তীর্ণ হলে আপনার নাম কোরিয়ার ‘জব রোস্টার’-এ অন্তর্ভুক্ত হবে এবং কোরিয়ান মালিকরা সেখান থেকে কর্মী বাছাই করে ওয়ার্ক পারমিট পাঠাবেন। কোরিয়ায় বর্তমানে একজন সাধারণ কর্মীর মাসিক আয় দেড় থেকে দুই লাখ টাকার ওপরে।

জর্ডানে নারী ও পুরুষ কর্মীদের নিয়োগ ও সুবিধা

বাংলাদেশের নারীদের জন্য জর্ডানের গার্মেন্টস সেক্টর একটি আশীর্বাদস্বরূপ। জর্ডানের স্বনামধন্য টেক্সটাইল কোম্পানিগুলো (যেমন: ক্লাসিক ফ্যাশন) বোয়েসেলের মাধ্যমে নারী মেশিন অপারেটরদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে নিয়োগ দেয়।

জর্ডানে যাওয়ার ক্ষেত্রে বিমান ভাড়া, থাকা-খাওয়া এবং যাতায়াতের সম্পূর্ণ খরচ নিয়োগকারী কোম্পানি বহন করে। কর্মীকে শুধু নিজের পাসপোর্ট তৈরি, মেডিকেল টেস্ট এবং ফিঙ্গারপ্রিন্টের সামান্য কিছু ফি দিতে হয়। বোয়েসেল প্রায় প্রতি শুক্রবারেই ঢাকা, চট্টগ্রাম বা বিভিন্ন জেলার টিটিসি (Technical Training Center)-তে সরাসরি ইন্টারভিউ ও স্কিল টেস্টের আয়োজন করে। সেলাই মেশিনের কাজ জানা থাকলে খুব সহজেই ইন্টারভিউ দিয়ে ২-৩ মাসের মধ্যে জর্ডানের ফ্লাইটে ওঠা সম্ভব।

বোয়েসেলের মাধ্যমে বিদেশ যাওয়ার খরচ কত?

বোয়েসেলের মাধ্যমে বিদেশে যাওয়ার খরচ সম্পূর্ণ সরকারি নীতিমালায় নির্ধারিত। জর্ডানের মতো দেশে জিরো কস্টে যাওয়া যায়, আর দক্ষিণ কোরিয়া বা ইউরোপের দেশগুলোতে যেতে বোয়েসেলের সার্ভিস চার্জ, মেডিকেল ফি ও বিমান ভাড়াসহ সাধারণত ১ থেকে আড়াই লক্ষ টাকার বেশি খরচ হয় না।

সাধারণত দালালরা বিদেশে পাঠানোর কথা বলে ব্ল্যাংক চেক বা স্ট্যাম্পে সই নিয়ে নেয় এবং লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। কিন্তু বোয়েসেলের খরচের হিসাবটি দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। এখানে কোনো লুক্কায়িত চার্জ বা হিডেন কস্ট নেই। আপনার কত টাকা খরচ হবে, তা সার্কুলার প্রকাশের দিনই স্পষ্ট করে লিখে দেওয়া হয়।

নামমাত্র খরচে বা জিরো কস্টে মাইগ্রেশন

বোয়েসেলের সবচেয়ে যুগান্তকারী দিক হলো তাদের ‘জিরো কস্ট’ মাইগ্রেশন সুবিধা। জর্ডান বা সেশেলসের মতো দেশগুলোতে যখন টেক্সটাইল বা হসপিটালিটি সেক্টরে কর্মী চাওয়া হয়, তখন ভিসা ফি থেকে শুরু করে বিমান ভাড়া—সবকিছু নিয়োগকারী কোম্পানি বহন করে। কর্মীকে শুধুমাত্র নিজের পাসপোর্ট তৈরি, নামমাত্র মূল্যে ফিঙ্গারপ্রিন্ট এবং মেডিকেল টেস্টের খরচটুকু বহন করতে হয়, যা ৫ থেকে ১০ হাজার টাকার বেশি নয়। এটিকে আক্ষরিক অর্থেই ‘বিনা খরচে বিদেশ যাওয়া’ বলা চলে।

সার্ভিস চার্জ এবং ভিসা প্রসেসিং ফি (সরকারি চার্ট)

যেসব দেশে কর্মীদের বিমান ভাড়া নিজেদের বহন করতে হয় (যেমন: কোরিয়া বা ইউরোপের দেশগুলো), সেখানেও বোয়েসেলের সার্ভিস চার্জ খুবই সামান্য।

  • বোয়েসেল সার্ভিস চার্জ: বোয়েসেল তাদের সেবার জন্য সাধারণত ৪২,০০০ থেকে ৪৫,০০০ টাকা সার্ভিস চার্জ নিয়ে থাকে। এই টাকা কখনোই নগদে দেওয়া যায় না। আপনাকে সোনালী ব্যাংক বা নির্ধারিত ব্যাংকে গিয়ে ‘বোয়েসেল’-এর নামে পে-অর্ডার (Pay Order) করতে হবে।

  • বিএমইটি (BMET) ফি ও কল্যাণ তহবিল: স্মার্ট কার্ড এবং প্রবাসী কল্যাণ তহবিলের জন্য সরকারি ফি প্রায় ৪,০০০ টাকা।

  • বিমান ভাড়া ও অন্যান্য: ইউরোপে ওয়ান-ওয়ে (One-way) এয়ার টিকেটের দাম সাধারণত ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার মতো হয়। ভিসা স্ট্যাম্পিং এবং মেডিকেল টেস্টের জন্য আরও ১৫-২০ হাজার টাকা লাগতে পারে।

সব মিলিয়ে ইউরোপ বা কোরিয়ায় যেতে আপনার পকেট থেকে সর্বোচ্চ দেড় থেকে আড়াই লাখ টাকা খরচ হবে। যেখানে দালালরা একই কাজের জন্য ১০-১২ লাখ টাকা দাবি করে, সেখানে বোয়েসেলের এই স্বচ্ছ ফি স্ট্রাকচার প্রবাসী কর্মীদের জন্য এক বিশাল আশীর্বাদ।

বোয়েসেল এর মাধ্যমে কিভাবে বিদেশ যাওয়া যায়? (Step-by-Step Guide)

বোয়েসেলের মাধ্যমে বিদেশ যাওয়ার জন্য প্রথমে অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে সঠিক সার্কুলার খুঁজে বের করতে হবে। এরপর অনলাইনে বা সরাসরি ফর্ম পূরণ করে স্কিল টেস্ট বা ইন্টারভিউতে অংশ নিতে হবে। চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হলেই কেবল ফি জমা দেওয়ার প্রশ্ন আসে।

অনেক প্রার্থীর মনেই একটি ভ্রান্ত ধারণা আছে যে, বোয়েসেল অফিসে গিয়ে পাসপোর্ট জমা দিলেই হয়তো বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। বোয়েসেল এভাবে কাজ করে না। তারা শুধুমাত্র সুনির্দিষ্ট ‘নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি’ বা সার্কুলারের ভিত্তিতে কাজ করে।

সঠিক সার্কুলার ও বিদেশের বর্তমান খবর খোঁজার উপায়

ফেসবুকে বা ইউটিউবে ছড়ানো গুজবে কান দেবেন না। বোয়েসেলের যেকোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি সবার আগে তাদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট (www.boesl.gov.bd)-এর ‘নোটিশ বোর্ড’ বা ‘চলমান নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি’ সেকশনে আপলোড করা হয়। এছাড়া, দৈনিক প্রথম সারির পত্রিকাগুলোতেও তারা বিজ্ঞাপন দেয়। আপনি যদি সত্যি বিদেশ যেতে চান, তবে আপনার প্রথম কাজ হলো সপ্তাহে অন্তত তিন দিন বোয়েসেলের ওয়েবসাইট চেক করার অভ্যাস গড়ে তোলা।

বোয়েসেল আবেদন ফরম কোথায় পাওয়া যায় এবং পূরণের নিয়ম

অনেকেই গুগলে BOESL application form লিখে খোঁজেন। জেনে রাখুন, বোয়েসেলের সার্কুলারগুলোর আবেদন প্রক্রিয়া মূলত দুই ধরনের হয়:

১. অনলাইন ফর্ম (Google Form): ইউরোপ বা কোরিয়ার সার্কুলারে সাধারণত একটি গুগল ফর্মের লিংক দেওয়া থাকে। সেখানে নিজের নাম, পাসপোর্ট নম্বর, পেশা এবং অভিজ্ঞতার তথ্য লিখে সাবমিট করতে হয়। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি। শর্টলিস্টেড হলে তারা আপনাকে এসএমএস দিয়ে ইন্টারভিউয়ের জন্য ডাকবে।

২. সরাসরি ওয়াক-ইন ইন্টারভিউ (Walk-in Interview): জর্ডান বা মধ্যপ্রাচ্যের কিছু সার্কুলারের ক্ষেত্রে কোনো অনলাইন আবেদনের প্রয়োজন হয় না। সার্কুলারে একটি নির্দিষ্ট তারিখ ও টিটিসি (Technical Training Center)-এর ঠিকানা দেওয়া থাকে। আপনাকে আপনার সিভি, পাসপোর্টের কপি এবং শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ নিয়ে সরাসরি ওই ঠিকানায় উপস্থিত হয়ে ইন্টারভিউ দিতে হয়।

স্কিল টেস্ট এবং ইন্টারভিউ প্রস্তুতি

সরকারিভাবে বিদেশ যাওয়ার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ‘স্কিল টেস্ট’ বা দক্ষতা পরীক্ষা। বোয়েসেল আপনাকে চেহারা দেখে নির্বাচন করবে না। ইউরোপে কনস্ট্রাকশন বা ওয়েল্ডিংয়ের কাজের জন্য গেলে বিদেশি প্রতিনিধিরা সরাসরি ঢাকায় এসে আপনার কাজ পরীক্ষা করবেন। ইট গাঁথুনি, রড বাইন্ডিং বা পাইপ ফিটিংয়ের প্রাকটিক্যাল টেস্টে পাস করলে তবেই আপনি পরবর্তী ধাপের জন্য যোগ্য হবেন। তাই বিদেশে যাওয়ার আগে দেশের যেকোনো সরকারি টিটিসি থেকে নিজের পেশার ওপর একটি প্রাকটিক্যাল শর্ট-কোর্স করে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।

দালাল বা প্রতারক চক্র থেকে সাবধান থাকার উপায়

বোয়েসেলের কোনো অনুমোদিত সাব-এজেন্ট, দালাল বা থার্ড-পার্টি নেই। কেউ যদি বোয়েসেলের ভিসা পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে নগদ টাকা দাবি করে, তবে ধরে নেবেন সে শতভাগ প্রতারক। সমস্ত লেনদেন কেবল সরকারি ব্যাংকের পে-অর্ডারের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।

⚠️ প্রতারণা থেকে বাঁচার অ্যালার্ট বক্স:

  • বোয়েসেলের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী কখনোই ব্যক্তিগতভাবে আপনার কাছে টাকা চাইবে না।
  • ফেসবুকে “বোয়েসেলের ফর্ম পূরণ করে দিচ্ছি, বিকাশে ৫০০ টাকা পাঠান”—এমন প্রতারক থেকে দূরে থাকুন। বোয়েসেলের আবেদন সম্পূর্ণ ফ্রি।
  • অনেকে নিজেকে ‘মন্ত্রণালয়ের লোক’ বা ‘বোয়েসেলের বড় কর্মকর্তার আত্মীয়’ পরিচয় দিয়ে ভিসা নিশ্চিত করার গ্যারান্টি দেয়। মনে রাখবেন, স্কিল টেস্টে বিদেশি ডেলিগেটরা সরাসরি ইন্টারভিউ নেন, এখানে বোয়েসেলের নিজেদেরও কোনো সুপারিশ করার সুযোগ নেই।
  • সবসময় মনে রাখবেন: বোয়েসেলে কোনো নগদ বা ক্যাশ লেনদেন হয় না।

বোয়েসেলের যোগাযোগ তথ্য

বোয়েসেলের একমাত্র প্রধান কার্যালয় ঢাকার ইস্কাটনে অবস্থিত, এর বাইরে দেশে আর কোনো শাখা অফিস নেই। সঠিক তথ্যের জন্য সরাসরি অফিসে ভিজিট করতে পারেন অথবা তাদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ও হটলাইন নম্বরে যোগাযোগ করতে পারেন।

গ্রামাঞ্চলের অনেক সাধারণ মানুষ মনে করেন, হয়তো তাদের জেলা শহরে বোয়েসেলের কোনো অফিস আছে। এই ভুল ধারণার সুযোগ নিয়েই গ্রাম্য দালালরা ফেক অফিস খুলে বসে থাকে।

বোয়েসেল ওয়েবসাইট ও অফিসিয়াল নোটিশ বোর্ড

যেকোনো তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য তাদের একমাত্র ঠিকানা হলো: www.boesl.gov.bd। এছাড়া ‘Bangladesh Overseas Employment and Services Limited’ নামে তাদের একটি ভেরিফাইড (ব্লু-ব্যাজ যুক্ত) ফেসবুক পেজ রয়েছে, যেখানে নিয়মিত আপডেট দেওয়া হয়।

বোয়েসেল অফিস ঢাকা কোথায় এবং মোবাইল নাম্বার

যেকোনো প্রয়োজনে সরাসরি যোগাযোগ করার জন্য BOESL contact number Dhaka এবং অফিসিয়াল ঠিকানা নিচে দেওয়া হলো:

  • ঠিকানা: প্রবাসী কল্যাণ ভবন (৫ম তলা), ৭১-৭২ ইস্কাটন গার্ডেন, রমনা, ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ।

  • ফোন নম্বর: +880-2-48319125, 48317515 (অফিস চলাকালীন সময় সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত)

  • ইমেইল: [email protected]

Frequently Asked Questions (FAQ)

সরকারিভাবে কোন কোন দেশে যাওয়া যায়?

বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে সরকারিভাবে বা বোয়েসেলের মাধ্যমে দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, জর্ডান, রোমানিয়া, ক্রোয়েশিয়া, কুয়েত, কাতার এবং সেশেলসসহ আরও কয়েকটি দেশে যাওয়া যায়। এই দেশগুলোতে নির্দিষ্ট মেয়াদের ওয়ার্ক পারমিট ভিসায় দক্ষ ও আধা-দক্ষ কর্মী পাঠানো হয়।

বোয়েসেলের মাধ্যমে ইউরোপের কোন কোন দেশে যাওয়া যায় এবং খরচ কত?

বোয়েসেলের মাধ্যমে পূর্ব ইউরোপের দেশ যেমন—রোমানিয়া, ক্রোয়েশিয়া, সার্বিয়া ও বুলগেরিয়াতে কর্মী নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। কনস্ট্রাকশন ও সার্ভিস সেক্টরে যাওয়ার জন্য বিমান ভাড়া, ভিসা ফি এবং সার্ভিস চার্জসহ মোট সরকারি খরচ সাধারণত ২ লাখ থেকে আড়াই লাখ টাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।

বোয়েসেল অফিসের বিদেশের বর্তমান খবর কী?

বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ার ইপিএস (EPS) লটারির মাধ্যমে রেকর্ড সংখ্যক কর্মী যাচ্ছে। এছাড়া জর্ডানের গার্মেন্টস সেক্টরে নিয়মিত নারী মেশিন অপারেটরদের সরাসরি স্কিল টেস্ট চলছে এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে দক্ষ শ্রমিকের চাহিদাপত্র অনুযায়ী নিয়মিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হচ্ছে।

বোয়েসেল আবেদন ফরম কোথায় পাওয়া যায়?

বোয়েসেলের আবেদন ফরম তাদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট (boesl.gov.bd)-এর নোটিশ বোর্ডে পাওয়া যায়। বিজ্ঞপ্তিতে দেওয়া লিংক ব্যবহার করে অনলাইনে বিনামূল্যে ফর্ম পূরণ করা যায় অথবা ওয়াক-ইন ইন্টারভিউয়ের দিন সরাসরি ইন্টারভিউ কেন্দ্রে গিয়ে হার্ডকপি ফর্ম জমা দেওয়া যায়।

আপনার পরবর্তী করণীয়

বিদেশে একটি সম্মানজনক ও নিরাপদ ক্যারিয়ার গড়ার জন্য বোয়েসেল হলো বাংলাদেশের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান। তবে এখানে কোনো ম্যাজিক নেই; আপনার যোগ্যতা এবং দক্ষতাই আপনার সবচেয়ে বড় পুঁজি। আপনি যদি কোরিয়ায় যেতে চান, তবে আজ থেকেই কোরিয়ান ভাষা শেখা শুরু করুন। যদি ইউরোপে যেতে চান, তবে হাতের কোনো কারিগরি কাজ (যেমন: ওয়েল্ডিং, প্লাম্বিং, ইলেকট্রিক্যাল কাজ) ভালোভাবে আয়ত্ত করুন।

পাসপোর্ট যদি করা না থাকে, দ্রুত বানিয়ে ফেলুন। দালালদের লোভনীয় মিথ্যা আশ্বাসে ভুলে জীবনের সর্বস্ব হারাবেন না। ধৈর্য ধরে নিজের স্কিল ডেভেলপ করুন এবং প্রতিনিয়ত বোয়েসেলের ওয়েবসাইটে চোখ রাখুন। সঠিক প্রস্তুতি এবং সঠিক তথ্যই আপনাকে পৌঁছে দিতে পারে আপনার স্বপ্নের গন্তব্যে। আপনার নিরাপদ প্রবাস জীবনের জন্য শুভকামনা!

আরও পড়ুন: শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক এসএসসি শিক্ষাবৃত্তি: যোগ্যতা, শর্ত ও আবেদন পদ্ধতি

Related Posts

Walton Job Circular Banner

Walton Hi-Tech Industries-এ “Creative Writer” পদে চাকরির সুযোগ, কর্মস্থল Dhaka

স্কুল কলেজের ছুটির তালিকা

স্কুল-কলেজের ছুটির তালিকা সংশোধন ও একাদশ শ্রেণির ক্লাস পিছালো: নতুন প্রজ্ঞাপন জারি

দেশের পোশাক শিল্পে ক্যারিয়ার: সম্ভাবনা, সুযোগ ও উচ্চশিক্ষিতদের ভবিষ্যৎ গাইডলাইন

দেশের পোশাক শিল্পে ক্যারিয়ার: সম্ভাবনা, সুযোগ ও উচ্চশিক্ষিতদের ভবিষ্যৎ গাইডলাইন

6 thoughts on “BOESL-এর মাধ্যমে কোন কোন দেশে যাওয়া যায় ও আবেদন প্রক্রিয়া”

  1. আমি জাপান জেতে চাই কেয়ারগিভার এই কাজে আমি কি ভাবে কি করবো

    Reply
  2. আসসালামু আলাইকুম ইটালির ভিসা সার্কুলার কবে হবে আমি ইটালি বা রোমানিয়া জেতে চাই

    Reply
  3. I would like to go any country in Europe for TR work VISA .
    I can speak & understand English well. I am a good professional manager in garments production sector with 18 years experience. I have a good knowledge to handle foreign delegates & buyers. I have to lead 1000 above associates under my team.
    I am also a good Biker & Light vehicle Driver with valid licence .I can operate the basic work in computer & mail corresponding.

    Reply
    • Given your strong profile (18 years of management experience, English fluency, and computer literacy), you may also explore direct job portals like LinkedIn, European recruitment agencies, or country-specific job portals (such as Croatia/Romania job boards) to look for Garments Production Manager or Operations Manager roles.

      Reply

Leave a Comment